
• দেশীয় পণ্যকে বিদেশি বলে প্রচার।
• এমএলএম নেটওয়ার্ক পদ্ধতিতে অতিরিক্ত আয়ের প্রলোভন দিয়ে অর্থ আত্মসাত ।
• পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও বিপণন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন?
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকার রামপুরা ডিআইটি রোডস্থ মালিবাগ রেলক্রসিং সংলগ্ন ১১৬ নং ডোম-ইনো বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত "ন্যাচারাল ভারটেক্স" নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারণা ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে।
উক্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পর্ষদে যাদের নাম পাওয়া যায় তারা হলেন কোম্পানির প্রধান সি,ই,ও ডেসটিনি খ্যাত সাইদুল ইসলাম খাঁন রুবেল।তারই নেত্রীত্বে কোম্পানির চেয়ারম্যান করা হয়েছে শেখ হেলাল উদ্দিন অপুকে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছে হোমিওপ্যাথি ডাক্তার জনাব আনোয়ার হোসেন আব্দুর রাজ্জাক।এছাড়া পরিচালক পর্ষদে রয়েছে প্রথম আইডি হোল্ডার ওয়াসিম আকরাম, কোম্পানির সুপার আইকন খ্যত এসএম কাকন, মানবাধিকার প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক আবুল হাছান সহ একাধিক ব্যাক্তির নাম।এছাড়া ন্যাচারাল ভারটেক্স এর ওয়েবসাইটে কোম্পানির কয়েকটি পণ্যের ছবি ছাড়া বিশেষ কোনো তথ্য না থাকলেও বেশ কিছু বিদেশি নাগরিকদের মন্তব্য পাওয়া যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় উক্ত ভবনের ২য় তলায় সারি সারি রুমে টেবিল চেয়ার সাজানো। বিশাল ফ্ল্যাটে রয়েছে চেয়ারম্যান,ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং সি,ই,ও সহ পরিচালকদের আলাদা কামরা। এছাড়া খালি জায়গা গুলোতে চেয়ার টেবিল দিয়ে সাজানো রয়েছে, সেগুলোতে দেখা যায় আগত মানুষে ভিড়। একপ্রান্তে রয়েছে ক্যান্টিন ব্যবস্থা,অন্যদিকে রয়েছে সেমিনার কক্ষ। মানব দেহের চিকিৎসার আদ্যপ্রান্ত নিয়ে অভিনব কৌশলে কোম্পানির আবিষ্কৃত ঔষধের গুনাগুন সম্পর্কে লেকচার দিতে দেখা যায়। বিশেষ করে বাড়তি আয়ের লোভনীয় অফার দিতে দেখা যায়। দৈনিক দুই হাজার ডলার ইনকাম করার সুযোগ রয়েছে,বাংলা টাকা ২,৬০,০০০/= দুই লাখ ষাট হাজার টাকা, প্রতি মাসে ৭৮ লক্ষ টাকা ইনকামের লোভনীয় অফার দেন তারা।সেমিনারে থাকা লোকজন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে কিভাবে প্রতিমাসে ৭৮ লক্ষ টাকা ইনকাম করা যায় সেই কথা শোনার চেষ্টা করেন। সেমিনার শেষে চিকিৎসা সেবার কিছু না বুঝলেও তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানান ছয় হাজার টাকার দুটি প্যাকেজ বারো হাজার টাকায় ক্রয় করে কিভাবে দিনে দুই লাখ ষাট হাজার টাকা ইনকাম করা যায় এমনটাই সেমিনারে বলা হয়েছে। সেনিনার দেখতে আসা ছালমা আক্তার নামের এক অর্ধ শিক্ষিত নারী জানায় এমন সুযোগ জীবনে আর কখনো দেখিনি, তিনি সহ কয়েকজনের কাছ থেকে একই মন্তব্য পাওয়া যায়।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি দেশীয়ভাবে উৎপাদিত কিছু পণ্য বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বলে প্রচার করছে এবং ব্যবসায়িক অংশীদার হওয়ার নামে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করছেন। শুধু তাই নয় কোম্পানির নির্ধারিত আয়ের টার্গেট ফিলাপ করতে আগত অতিথিদের আপ্যায়নে চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে যেনো সবাই আকৃষ্ট হয়।
একাধিক অংশগ্রহণকারীর অভিযোগ, তাদের জানানো হয়েছে ১২ হাজার টাকার দুটি প্যাকেজ ক্রয়ের পর অন্যদের কাছে একই কায়দায় বিক্রি করতে পারলে কমিশনের মাধ্যমে দৈনিক দুই হাজার ডলার ইনকাম করা যাবে। অনেকেই শতো চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে নিরাশ হচ্ছেন। কোম্পানির কিছুলোক আশাহতদের সামনে বারবার উল্লেখ করেন আমরা পারলে আপনারাও পারবেন এভাবেই ব্রেনওয়াশ করা হয়।
ন্যাচারাল ভারটেক্স এর পণ্য মালয়েশিয়া ও সুইজারল্যান্ডের তৈরি বলে দাবি করা হলেও আমদানি সংক্রান্ত কাস্টমস নথি, বিল অব এন্ট্রি বা অন্যান্য প্রমাণপত্র সম্পর্কে কোম্পানির সিইওর নিকট জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেনি।
জানা যায় ন্যাচারাল ভারটেক্স পণ্য চট্টগ্রামে অবস্থিত গাজী ফার্মা ল্যাবরেটরীতে উৎপাদন করা হচ্ছে। বিপণনকৃত পণ্য এনভি মিক্স, স্টিমসেল, এনভি পিওর ডিটক্স, প্রিমিয়াম এনভি কফি, পণ্যের মোড়কে বিদেশি ব্র্যান্ড ও আন্তর্জাতিক মানের এফডিএ সহ একাধিক সনদের সিল লাগানো হচ্ছে। যার যথাযথ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া পণ্যের মূল্য নির্ধারণের যৌক্তিকতা নিয়েও ভোক্তাদের প্রশ্ন রয়েছে।
এসব পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০০০ টাকা। বিক্রির ৪০% টাকা মালিকানায় যায়, ৫০% নেটওয়ার্কারদের মাঝে বন্টন করা হয়, অবশিষ্ট ১০% উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাবদ নির্ধারণ করা হয়েছে। পণ্যের উৎপাদন ব্যায় ও বিক্রয়ে ব্যাপক ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে।
নিয়ম বহিঃভূত উচ্চ মূল্যে নির্ধারণ করা প্যাকেজ দুটি ১২ হাজার টাকা পরিশোধ করলেই কমিশন ভিত্তিতে অনলাইনে সদস্য হয়ে ব্যবসার সুযোগ রয়েছে। শুধু নিজে ক্রয় করলে হবেনা পর্যায়ক্রমে একাধিক ব্যক্তির নিকট পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে কমিশন পাবেন। এভাবে ন্যাচারাল ভারটেক্স কর্তৃপক্ষ কৌশলে লোভনীয় পদ্ধতিতে পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম চলিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যবসা বাস্তবে কমিশনভিত্তিক সদস্য সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল হলে সেটি প্রচলিত বাণিজ্য ও ভোক্তা সুরক্ষা আইনের আলোকে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তে প্রমানিত হলে দণ্ডনীয় অপরাধ ও শাস্তি যোগ্য হবে।
ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায় দেশীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যকে বিদেশি হিসেবে উপস্থাপন করা এবং তা প্রমাণিত হলে এটি আইন লঙ্ঘনের শামিল।কোম্পানির বৈধ অনুমোদন ও বিপণন পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মতামত জানতে চাইলে দেশি ঔষধ বিদেশি বলে বিক্রয় করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতামত স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন থাকা আবশ্যক।
বাংলাদেশের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী কোনো পণ্যের উৎপত্তি, গুণগত মান বা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিক্রি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া ওষুধ আইন, ১৯৪০, ড্রাগস (কন্ট্রোল) অধ্যাদেশ, ১৯৮২ এবং প্রচলিত ওষুধ প্রশাসন সংক্রান্ত বিধিমালা অনুযায়ী ওষুধ বা স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, প্রচার ও বিপণনে নির্ধারিত অনুমোদন ও শর্ত পালন করা বাধ্যতামূলক।
প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্বে ন্যাচারাল ভারটেক্সের সিইও জনাব সাইদুল ইসলাম খান রুবেলের কাছে বক্তব্য চেয়ে পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানের বিস্তারিত তথ্য ২য় পর্বে প্রকাশিত হবে।